স্বামীর নাম মুখে নিলে কী হয়

সংগৃহীত ছবি

 

ধর্ম ডেস্ক : আমাদের সমাজের কোনো কোনো অঞ্চলে নারীদের মাঝে স্বামীর নাম উচ্চারণ নিয়ে একটি অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন ভীতি কাজ করে। ধারণা রয়েছে যে, স্বামীর নাম মুখে নিলে বা নাম ধরে ডাকলে স্বামীর হায়াত কমে যায়। এর চেয়েও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অনেক স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত নারী মনে করেন, স্বামীর নাম মুখে নেওয়া এতটাই বড় অপরাধ যে, এতে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয় অর্থাৎ ‘তালাক’ হয়ে যায়।

কিন্তু দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণাগুলো নিছকই কুসংস্কার, যার সঙ্গে ইসলামি শরিয়তের দূরতম সম্পর্ক নেই।

তালাক হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তবতা

সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যেসব অঞ্চলে দ্বীনি ইলম বা ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা কম, সেখানে এই কুসংস্কারগুলো বেশি প্রবল। কোনো কোনো নারী মনে করেন, ভুলবশত স্বামীর নাম মুখে আনলেই সংসার ভেঙে যাবে। এ প্রসঙ্গে ওলামায়ে কেরামদের স্পষ্ট অভিমত হলো- স্বামীর নাম মুখে নিলে বা তাকে নাম ধরে ডাকলে স্ত্রী তালাক হয়ে যায়, এই কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। ইসলামের বিধানে তালাক হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, যার মধ্যে ‘নাম ধরে ডাকা’ অন্তর্ভুক্ত নয়।

হাদিস ও ফিকহি ফতোয়া

নাম উচ্চারণ করলে স্বামী যদি মনে কষ্ট না পায় বা নিজের সম্মানহানী মনে না করে, তাহলে নাম ধরে ডাকলে সমস্যা নেই বা মাকরুহ হবে না। আসলে বিষয়টি নির্ভর করে দেশীয় সংস্কৃতি ও রেওয়াজের ওপর। হাদিসে এসেছে, ‘যখন আল্লাহর রাসুল ইবরাহিম (আ.) তার স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাইলকে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে চলে যাচ্ছিলেন, তখন পেছন থেকে তার স্ত্রী তাকে ডাকলেন এভাবে- ‘হে ইবরাহিম, আপনি আমাদের (এমন জনমানবহীন উপত্যকায়) কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?’ (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৫)

বাংলাদেশে সাধারণত স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে অসম্মানজনক ও বেয়াদবি মনে করা হয়, তাই এতদঞ্চলে স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে ফুকাহায়ে কেরাম মাকরুহে তানজিহি বা শরিয়তে অপছন্দ বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করেন। (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার: ০৬/৪১৮)

এই ফতোয়া থেকে এটি পরিষ্কার যে, স্বামীকে নাম ধরে ডাকা শিষ্টাচারের খেলাফ হতে পারে, কিন্তু এটি এমন কোনো অপরাধ নয় যার কারণে বিয়ে ভেঙে যাবে বা তালাক হয়ে যাবে।

শিষ্টাচার বনাম হালাল-হারাম

ইসলামে স্বামীকে সম্মান করা স্ত্রীর জন্য জরুরি। আমাদের উপমহাদেশের সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী, স্বামীকে নাম ধরে ডাকা অসম্মানজনক মনে করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এড়িয়ে চলাই উত্তম। কিন্তু একে ‘হারাম’ বা ‘কুফরি’ কাজ মনে করা কিংবা এর কারণে তালাক হয়ে যাবে ভাবা ধর্মীয় অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আরব দেশগুলোতে নারীরা স্বামীদের নাম ধরেই সম্বোধন করেন এবং সেখানে এটিকে সামাজিকভাবে দোষণীয় মনে করা হয় না।

অতএব, স্বামীর নাম নিলে তালাক হয় না এবং হায়াতও কমে না। তবে দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য। সামাজিক যেকোনো দৃষ্টিকটূ বিষয় এড়িয়ে চলাই শোভনীয়। কিন্তু ভিত্তিহীন কুসংস্কারকে ধর্মীয় বিধান বা তালাকের কারণ মনে করা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা

» ইসির নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণায় শাবিতে বিক্ষোভ

» রিজার্ভ চুরি মামলার প্রতিবেদন দাখিল ১৮ ফেব্রুয়ারি

» কেমন হওয়া উচিত সকালের নাস্তা?

» অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিস বা হাড় নষ্ট হয়ে যাওয়া রোগ

» নতুন মায়েদের জন্য পরামর্শ

» কানাডায় শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা শিক্ষার মান উন্নয়নে আলোচনা সভা

» জামায়াত আমিরের সঙ্গে ঢাকাস্থ জার্মান রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

» বাবুর্চিকে কুপিয়ে হত্যা

» গরু ভাগাভাগি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ছেলের হাতে বাবা খুন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

স্বামীর নাম মুখে নিলে কী হয়

সংগৃহীত ছবি

 

ধর্ম ডেস্ক : আমাদের সমাজের কোনো কোনো অঞ্চলে নারীদের মাঝে স্বামীর নাম উচ্চারণ নিয়ে একটি অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন ভীতি কাজ করে। ধারণা রয়েছে যে, স্বামীর নাম মুখে নিলে বা নাম ধরে ডাকলে স্বামীর হায়াত কমে যায়। এর চেয়েও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অনেক স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত নারী মনে করেন, স্বামীর নাম মুখে নেওয়া এতটাই বড় অপরাধ যে, এতে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয় অর্থাৎ ‘তালাক’ হয়ে যায়।

কিন্তু দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণাগুলো নিছকই কুসংস্কার, যার সঙ্গে ইসলামি শরিয়তের দূরতম সম্পর্ক নেই।

তালাক হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তবতা

সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যেসব অঞ্চলে দ্বীনি ইলম বা ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা কম, সেখানে এই কুসংস্কারগুলো বেশি প্রবল। কোনো কোনো নারী মনে করেন, ভুলবশত স্বামীর নাম মুখে আনলেই সংসার ভেঙে যাবে। এ প্রসঙ্গে ওলামায়ে কেরামদের স্পষ্ট অভিমত হলো- স্বামীর নাম মুখে নিলে বা তাকে নাম ধরে ডাকলে স্ত্রী তালাক হয়ে যায়, এই কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। ইসলামের বিধানে তালাক হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, যার মধ্যে ‘নাম ধরে ডাকা’ অন্তর্ভুক্ত নয়।

হাদিস ও ফিকহি ফতোয়া

নাম উচ্চারণ করলে স্বামী যদি মনে কষ্ট না পায় বা নিজের সম্মানহানী মনে না করে, তাহলে নাম ধরে ডাকলে সমস্যা নেই বা মাকরুহ হবে না। আসলে বিষয়টি নির্ভর করে দেশীয় সংস্কৃতি ও রেওয়াজের ওপর। হাদিসে এসেছে, ‘যখন আল্লাহর রাসুল ইবরাহিম (আ.) তার স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাইলকে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে চলে যাচ্ছিলেন, তখন পেছন থেকে তার স্ত্রী তাকে ডাকলেন এভাবে- ‘হে ইবরাহিম, আপনি আমাদের (এমন জনমানবহীন উপত্যকায়) কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?’ (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৫)

বাংলাদেশে সাধারণত স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে অসম্মানজনক ও বেয়াদবি মনে করা হয়, তাই এতদঞ্চলে স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে ফুকাহায়ে কেরাম মাকরুহে তানজিহি বা শরিয়তে অপছন্দ বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করেন। (রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার: ০৬/৪১৮)

এই ফতোয়া থেকে এটি পরিষ্কার যে, স্বামীকে নাম ধরে ডাকা শিষ্টাচারের খেলাফ হতে পারে, কিন্তু এটি এমন কোনো অপরাধ নয় যার কারণে বিয়ে ভেঙে যাবে বা তালাক হয়ে যাবে।

শিষ্টাচার বনাম হালাল-হারাম

ইসলামে স্বামীকে সম্মান করা স্ত্রীর জন্য জরুরি। আমাদের উপমহাদেশের সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী, স্বামীকে নাম ধরে ডাকা অসম্মানজনক মনে করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এড়িয়ে চলাই উত্তম। কিন্তু একে ‘হারাম’ বা ‘কুফরি’ কাজ মনে করা কিংবা এর কারণে তালাক হয়ে যাবে ভাবা ধর্মীয় অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আরব দেশগুলোতে নারীরা স্বামীদের নাম ধরেই সম্বোধন করেন এবং সেখানে এটিকে সামাজিকভাবে দোষণীয় মনে করা হয় না।

অতএব, স্বামীর নাম নিলে তালাক হয় না এবং হায়াতও কমে না। তবে দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য। সামাজিক যেকোনো দৃষ্টিকটূ বিষয় এড়িয়ে চলাই শোভনীয়। কিন্তু ভিত্তিহীন কুসংস্কারকে ধর্মীয় বিধান বা তালাকের কারণ মনে করা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com